৭ ই নভেম্বর ও আমরা

৭ই নভেম্বর ১৯৭৫ এ নিতান্তই শিশু ছিলাম আমি। তাই আমার স্মৃতি এই দিন সম্পর্কে কোন তথ্য জানাতে পারেনি আমাকে। রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠার পাশাপাশি নানা সময়ে পড়া বিভিন্ন প্রবন্ধ আর বিশ্লেষণ আমাকে ১৯৭৫ এর ৭ই নভেম্বর সম্পর্কে প্রাথমিক ধারনা দেয়। এর বাইরে, আমার এমন বহু মানুষের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছে যাঁরা রাজনৈতিক জগতের অনেক বাইরে বসবাস করেন অথচ স্বাধীনতা ও তার পরবর্তী উত্তাল সময়গুলোর নীরব সাক্ষী হয়ে আছেন।

আমার এই সব জানাশোনার প্রেক্ষিতে যদি আমি ইতিহাস বিশ্লেষণে যাই তাহলে অবাক করা কিছু সংযোগ আমাকে অভিভূত করে।

১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ ঠিক যেভাবে এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করে যে,বাংলাদেশ বৃটিশ শাসকের অবাস্তব পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রণীত পাকিস্তানের কোন অংশ নয়,বরং একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরও সেই একইভাবে এই সত্যের জন্ম দেয় যে,বাংলাদেশীরা স্বাধীন হয়েছে তাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ধরে রাখার জন্য,তারা সুসংহত হতে জানে এবং তারা কারো প্রভুত্ব মাথা পেতে নেওয়ার মানসিকতা রাখেনা।

১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাক আর্মির বিরুদ্ধে সশস্ত্র যোদ্ধার পাশাপাশি যেভাবে দেশের আপামর জনগন স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন ঠিক একই ভাবে ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবে নিতান্ত আটপৌরে জনগণ রাস্তায় নেমে এসেছিলেন সাধারণ সিপাহীদের সমর্থনে।

১৯৭১ সালের ভয়াবহ ক্রান্তিকালে ভীত সন্ত্রস্ত দেশবাসীর যে প্রবল প্রতীক্ষীত হৃদয় একজন ক্ষনজন্মা দেশপ্রেমিক এবং অকুতোভয় মেজরের বজ্রনির্ঘোষ কন্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণায় উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিল, রণাঙ্গনের সেই নায়ক খুব স্বাভাবিকভাবেই হয়ে উঠেছিলেন,জাতির আস্থা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্র। ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর নানা বিভ্রান্তিকর ঘটনা, পাল্টা ঘটনার চাপে দিশেহারা, দিকভ্রান্ত দেশবাসীর কানে বেজে উঠেছিল সেই একই কণ্ঠ,যা বয়ে এনেছিলো স্বস্তি ও নির্ভরতা। দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহনের দুর্লভ যোগ্যতা, দৃঢ়তা, দেশপ্রেম এবং তুখোড় জনপ্রিয় সেই অসাধারন সেনানায়কের কাঁধে আরো একবার জাতিকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব অর্পিত হলো। আরো একবার সমগ্র জাতি তাঁকে বরন করে নিলো সীমাহীন ভালোবাসায়।

১৯৭৫ সালেই ভয়ংকর ১৫ই আগষ্ট এর পর দৃশ্যমান যে সরকার দেশ শাসনের ভার গ্রহন করে,তার প্রায় সব সদস্যই ছিলেন আওয়ামীলীগের (সেইসময়ের বাকশাল) সদস্য। কোন রকম জোড়াতালি দিয়ে সরকার যেভাবে পরিচালিত হচ্ছিলো, তা ছিল অতিমাত্রায় দুর্বল। সিদ্ধান্তহীনতায় ভূগতে থাকা সরকারের এই শাসনকাল বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম কালো অধ্যায়। জাতির সীমাহীন দুর্ভাগ্য এই যে,এর যবনিকাপাত করতে যে ক্যুদেতা ঘটলো,তা জন্ম দিল আরেক পংকিল অধ্যায়ের।

২রা নভেম্বর শেষ হওয়ার পরে ৩রা নভেম্বরের প্রথম প্রহরে (রাত বারোটার পরে। সুত্র: দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্মৃতিচারন) জ্যোষ্ঠ্যতার তোয়াক্কা না করে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ক্যু এর মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে খন্দকার মোশতাকের সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করলেন এবং সেনাবাহিনী প্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করে তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করলেন।

খালেদ মোশাররফ ক্ষমতা দখলের পর পরই নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিলো, যদিও আমি শুধু কয়েকটা উল্লেখ করতে চাই।

৩রা নভেম্বর সকালে জেলের অভ্যন্তরে বাকশালের (আওয়ামীলীগের) চারজন অত্যন্ত বিখ্যাত এবং গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে হত্যা করা হলো।

১৫ই আগষ্টের হত্যাকান্ডের কুশীলবদের ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় দেশের বাইরে (ব্যাংককে) পাঠিয়ে দেওয়া হলো।

৩,৪ ও ৫ই নভেম্বর এই তিন দিন দেশে কোন সরকার ছিলো না। ক্যুদেতার নায়কেরা এই সময়টায় সরকার প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হলেন। ব্যর্থ হলেন তিন দিন ধরে বন্ধ রেডিও ও টিভি স্টেশন চালু করতে (এখানে একটি কথা উদ্ধৃত না করলেই নয়। বিখ্যাত লেখক এ্যান্থনী মাসকারানহাস তাঁর প্রসিদ্ধ বই “বাংলাদেশ এ লিগ্যাসী অফ ব্লাড” এ লিখেছেন যে, ‘সেই সময় খালেদ কি করেছিলেন তা বিষয় নয় বরং তিনি যা করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন সেটাই তাঁর পতনকে নির্ধারিত করে দিয়েছিল’)।

ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের এই ক্যু এর সংবাদ পার্শ্ববর্তী দেশ বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করতে থাকলো।

উপরের ঘটনাগুলো দেশব্যাপী, এক ধরনের ভীতি ও আতংকের জন্ম দিয়েছিল, যা সাধারন সিপাহি ও দেশবাসীকে নির্বাক করে ফেলেছিল। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে শংকা জেগেছিল সকলের মনে। এক দেশের (পাকিস্তান) দাসত্ব থেকে মুক্তির পর আরেক দেশের (ভারত) দাসত্বের যে, ভয়ংকর ভবিষ্যৎ দেশের মানুষের সামনে ভেসে উঠেছিল তা সবাইকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিয়েছিল।

এই অভূতপূর্ব অচলাবস্থা দেশের আপামর জনসাধারণ,বিশেষ করে সেনাবাহিনীর উপর সীমাহীন চাপ তৈরি করলো। জিয়াউর রহমান ছিলেন সাধারণ সেনা সদস্যদের মধ্যে অসম্ভব জনপ্রিয়। তাঁর অবসর ও অন্তরীন হওয়ার সংবাদ সকল সৈনিকের মনে ভীতি ও শংকার পাশাপাশি সীমাহীন ক্ষোভের জন্ম দিলো।

এই অবস্থার সুযোগে জাসদ সমর্থিত অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল তাহের এগিয়ে এলেন ঘটনাপ্রবাহকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে। সেনাবাহিনীর অফিসারদের নিধন এবং ক্ষমতা গ্রহনের এক অদ্ভুত পরিকল্পনা নিয়ে তিনি সাধারণ সৈন্যদের বিস্ফোরণমুখী স্রোতে মিশে গেলেন,ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের ক্যুকে বানচাল করতে । কিন্ত বিধি বাম,ব্যারাক থেকে বেরিয়ে পড়া সাধারণ সৈন্যরা জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার পরে অবধারিতভাবেই পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ চলে এলো জিয়াউর রহমানের হাতে। কর্নেল তাহেরের জিয়াকে হত্যা এবং ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পরিকল্পনা ধুলোয় মিশে গেলো। উপরন্তু তাঁর (কর্নেল তাহের) অফিসার হত্যার নির্মম পরিকল্পনার বলি হলেন অসংখ্য নির্দোষ অফিসার এবং তাঁকে এই সব অফিসারদের হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হলো।

সাধারন সৈনিকদের এই বিজয়ে ব্যাপক আলোড়ন ওঠলো আপামর জনগণের মাঝে। ৭ই নভেম্বরের প্রথম প্রহর থেকে যে বিজয়োৎসব শুরু হলো তা চলতে থাকলো সারাদিনব্যাপী। এতে সিপাহিদের সাথে যোগ দিলেন স্বতঃস্ফূর্ত দেশবাসী। নারীপুরুষ নির্বিশেষে সকলেই নেমে এলেন রাস্তায়। বিখ্যাত লেখক এ্যান্থনী মাসকারানহাসসহ অন্যান্য লেখকবৃন্দ এবং প্রতক্ষ্যদর্শীরা জনগনের এই আনন্দ উদযাপনকে তুলনা করেছেন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পরে উদযাপিত আনন্দের সাথে।

মনে রাখা দরকার, ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পরে প্রথমেই দেশ শাসনের দিকে মনযোগ না দিয়ে, জিয়াউর রহমান, বিশৃঙ্খল ও হতোদ্যম সেনাবাহিনীতে শৃংখলা এবং সাহস ফিরিয়ে আনার কাজে নিজেকে ব্যাপৃত করলেন। প্রমান করলেন তাঁর নেতৃত্বের স্বচ্ছতা ও শ্রেষ্ঠত্ব। সেই তাৎপর্যপূর্ণ ক্ষণ থেকেই মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের যাত্রা শুরু করেন বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়কের স্থান অর্জন করার পথে।

৭ই নভেম্বর সব অর্থেই বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও জাতীয়বাদী সংহতির বিজয়গাঁথা। কাজেই মহিমান্বিত এই দিনটির মর্যাদা দেওয়ার সাধ্য আওয়ামী লীগ রাখে না। আর চিরকালের বেনিয়া বাম দল তাদের পরাজয়ের দিনটিকে ভালোভাবে নিতে পারবেন তা আশা করাটাও বোকামি। এই বাম দলগুলো এবং আওয়ামীলীগের যুগলবন্দী তাই যে কোন মূল্যে ৭ই নভেম্বরের ইতিহাস পাল্টে দিতে বদ্ধ পরিকর। বেশ কয়েক বছর ধরে চলতে থাকা এই অপপ্রচারকে দলগুলো এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে,১৯৭৫ সালের নভেম্বরে সংঘটিত অভ্যুত্থানে মুখোমুখি অবস্থান নেওয়া সেই দুই শত্রু,কর্নেল তাহের এবং খালেদ মোশাররফ দুই জনই আজ তাদের পরিকল্পিত প্রচারণায় নভেম্বরে অভুত্থানের মহানায়কে পরিণত হয়েছেন।

আমি হতবাক হয়ে দেখি যে, ১৯৭৫ এর নভেম্বরের ক্যুএর ফলে জেলখানায় নিহত বিখ্যাত চার আওয়ামীলীগ নেতা, কুখ্যাত ক্যুএর নায়ক খালেদ মোশাররফ এবং সেনা অফিসার হত্যার পরিকল্পনাকারী বাম মদদপুষ্ট কর্নেল তাহের সকলের স্বজনই কোন না কোনভাবে এই সরকারের প্রত্যক্ষ অংশীদার হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন সরকার পরিচালনায়। ক্ষমতার কি যাদুকরী আকর্ষণ। স্বার্থ এবং লুব্ধতার কি নিদারুন সহাবস্থান।

৭ই নভেম্বর ১৯৭৫ এর সিপাহি-জনতার বিপ্লব এককভাবে বাংলাদেশীদের গৌরবের ইতিহাস। যে ইতিহাসকে মর্মে ধারন করে একটা জাতি ভেঙ্গে ফেলতে পারে শত প্রতিবন্ধকতা। জয়ী হতে পারে হাজারো অনাচারের বিরুদ্ধে। রুখে দিতে পারে যে কোন সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। ঠেকিয়ে দিতে পারে যে কোন আগ্রাসন। এবং সেটাই কাংখিত বাংলাদেশীদের ক্ষেত্রেও। শত অপপ্রচার এবং চাটুকার বুদ্ধিজীবীদের ঐকান্তিক ও লাগাতার প্রয়াসের পরও ৭ই নভেম্বর ১৯৭৫ এর সিপাহী বিপ্লব তার নিজস্ব দীপ্তিতে দীপ্তমান। বর্ষীয়ান প্রজন্ম যারা তাঁদের অন্তরে এই দিনটি ধারন করে আছেন অবিকৃতভাবে, তাঁরা সময় ও সুযোগমত ঠিকই তা পৌঁছে দিচ্ছেন পরের প্রজন্মের কাছে। ঠিক যেমনটি পৌঁছে গেছে আমার কাছে। আমি বিশ্বাস করি, ৭ই নভেম্বরের বিপ্লবের মূল ভাবনা এই ভাবেই ছড়িয়ে যাবে সকল তরুনের হৃদয়ে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

মাহমুদা হাবীবা
সদস্য, জি নাইন
চেয়ারম্যান, এন্টারপ্রেনিয়ার্স ফোরাম

কক্সবাজার জেলা জাতীয়তাবাদী পরিবার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, এর উদ্যোগে ইফতার মাহাফিল। ——————————————————— ২১/০৫/২০১৮'ইং দুবাই গোল্ডল্যান্ড হোটেল হল রুমে, হাজী নাছির উদ্দিন এর সভাপতিত্বে, এফ এ সোহেল চৌধ

...... বিস্তারীত এখানে বা শেয়ার করুন Share
পোষ্ট করেছেন jalil786.ae_1722, মে 25 | 307 বার পঠিত

আওয়ামী লীগের কাছে গণতন্ত্রের মূল্য কতটা?

...... বিস্তারীত এখানে বা শেয়ার করুন Share
পোষ্ট করেছেন Jessore BNP ITCell, মে 25 | 435 বার পঠিত

বাংলাদেশে আইসিটি’র বিকাশে তারেক রহমানের ভূমিকা

জুবায়ের তানভীর সিদ্দিকী

...... বিস্তারীত এখানে বা শেয়ার করুন Share
পোষ্ট করেছেন Jessore BNP ITCell, মে 20 | 1,549 বার পঠিত

জাতীয়তাবাদী যুবদল, সংযুক্ত আরব আমিরাত কেন্দ্রীয় যুবদল কর্তৃক আয়োজিত, ১৪ই এপ্রিল রোজ শনিবার, শারজাহ হুদাইবিয়া রেষ্টুরেন্টের হল রুমে এক বিশাল সাংগঠনিক সভার আয়োজন করা হয়। উক্ত সাংগঠনিক সভায় ইউ,এ,ই কেন

...... বিস্তারীত এখানে বা শেয়ার করুন Share
পোষ্ট করেছেন jalil786.ae_1722, এপ্রিল 15 | 4,479 বার পঠিত

'গতকাল প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বলেছেন-জনগণ ভোট দিলে আগামীতে আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতায় আ

...... বিস্তারীত এখানে বা শেয়ার করুন Share
পোষ্ট করেছেন Ferdous bin zaman tasmir, এপ্রিল 14 | 4,910 বার পঠিত

পৃষ্ঠাসমূহ