রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সাথে ব্যাপক সংঘর্ষ

রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সাথে ব্যাপক সংঘর্ষে অন্তত ১৬ জন আহত হয়েছে। সংঘর্ষকারিরা রাঙ্গামাটি কলেজ সংলগ্ন এলাকায় চারটি দোকানে অগ্নিসংযোগ-ভাংচুর ও লুটপাট চালায় এবং দুুইটি মোটর সাইকেলে অগ্নিসংযোগ করে।

এসময় উভয় পক্ষের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ায় কলেজসহ আশেপাশের এলাকা রনক্ষেত্রে পরিণত হয়। এক পর্যায়ে পুলিশ সংঘর্ষকারিদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেল ও শর্টগানের গুলি ছুড়ে। এসময় সংঘর্ষকারিরা দুই দিকে অবস্থান নিয়ে রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। পরিস্থিতির এক পর্যায়ে কলেজ থেকে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পরে আশে-পাশের এলাকায়।

দীর্ঘ দেড় ঘন্টাব্যাপী কলেজ গেইট কল্যাণপুর ও টিটিসি এলাকায় থেমে থেমে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ায় লিপ্ত হয় উভয়পক্ষ। এই ঘটনায় উভয় পক্ষের অন্তত ১৬ জন আহত হয়। আহতদের সেনাবাহিনীর সিএমএইচ ও রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে গেছে পুলিশ ও স্থানীয়রা। আহতদের মধ্যে ১৫ জনের নাম পাওয়া গেছে।

তারা হলেন- রুবেল (১৯), রুনল (১৮), অরন্য ত্রিপুরা সৌরভ (২২), নয়ন (৩০) হাসান (১৮), আব্দুল কাদের (১৯), ফারুক হোসেন (৩০), ফোরকান হোসেন (৩৫), এবিএম জুনায়েদ (১৭) বেলাল হোসেন (৩০), নুর হোসেন (৩৩), মেহেদী হাসান (২০) মোঃ আব্দুল হামিদ (৩০), মঈন উদ্দিন (২০), দুলাল হোসেন (৩০) ও টিপু (১৮)। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়। শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। শহরে বাড়ানো হয়েছে পুলিশের উপস্থিতি।

এদিকে ঘটনার পরপরই সেনাবাহিনীর উদ্বর্তন অফিসারগণ, রাঙামাটির জেলা প্রশাসক সামসুল আরেফিন ও পুলিশ সুপার সাঈদ তারিকুল হাসান, এডিশনাল এসপি মোঃ শহিদ উল্লাহ’র নেতৃত্বে প্রশাসনের উদ্বর্তন কর্মকর্তাগণ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন।

এসময় রাঙামাটি জেলা প্রশাসক মোঃ সামসুল আরেফিন জানিয়েছেন, পরিস্থিতি এখন শান্ত রয়েছে। এছাড়া স্থানীয় বাসিন্দাদেরকে কোনো গুজবে কান না দেওয়ার আহবান জানিয়ে জেলা প্রশাসক জানান, সামান্য একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতি যাতে করে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িকতা দিকে না যায় সেদিকে আমাদের সকলের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাঙ্গামাটি কলেজে ছাত্রলীগের সাপ্তাহিক মিছিলে পাহাড়ি ছাত্র-ছাত্রীদের অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এর আগে কলেজে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা মিছিল বের করলে পুলিশ ও সরকারদলীয়রা বাধা দিয়ে ছাত্রদলের মিছিল পন্ড করে দেয়। এরপর কলেজ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সাপ্তাহিক মিছিল বের করে। মিছিল শেষ হওয়ার পরপরই মিছিলে অংশ নেওয়ার অপরাধে অরন্য ত্রিপুরা সৌরভ নামের একছাত্রকে পিসিপি’র কর্মীরা ডেকে নিয়ে বেদম মারধর করে। এসময় অন্যান্য শিক্ষার্থীরা এগিয়ে গেলে উভয় পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।

ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অভিযোগ করে জানায়, পাহাড়ি কিছু শিক্ষার্থী মিছিলে অংশ নিলে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)র নেতাকর্মীরা তাদের উপর হামলা চালিয়ে মারধর করে। এই ঘটনায় সাধারন ছাত্রদের সাথে পিসিপি নেতাকর্মীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।

অপরদিকে সাধারন ছাত্ররা অভিযোগ করে জানায়, কোনো প্রকার উষ্কানী ছাড়াই পিসিপি’র সন্ত্রাসীরা আমাদের উপর হামলা চালিয়েছে। এছাড়া সংঘর্ষের সময় পুলিশের উপজাতীয় সদস্যরা বাঙ্গালী ছাত্রদের উপর নির্বিচারে টিয়ারশেল ও শর্টগানের গুলি ছুড়েছে। পুলিশের কতিপয় সদস্যের এই ধরনের দ্বৈত আচরনের প্রতিবাদ জানিয়েছে ছাত্রলীগসহ সাধারন শিক্ষার্থীরা।

অপরদিকে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, মেডিকেল কলেজ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বাতিলের আন্দোলনকে বানচাল করতে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে পিসিপি’র নেতাকর্মীদের উপর এই হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে পাঠানো এক বিবৃতিতে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ(পিসিপি)-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি থুইক্যচিং মারমা ও সাধারণ সম্পাদক রিটন চাকমা এক যুক্ত বিবৃতিতে শনিবার রাঙামাটি সরকারী কলেজ ক্যাম্পাসে প্রতিবাদকারী ছাত্রদের উপর ছাত্রলীগ কর্মীদের নির্বিচার হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি-বাঙালি দাঙ্গা বাঁধানোর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সবাইকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন।

রাঙামাটির পুলিশ সুপার সাঈদ তারিকুল হাসান জানিয়েছেন, পরিস্থিতি শান্তিপূর্ন অবস্থায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তিনি জানান, ছাত্রদের বিবদমান দুইটি পক্ষের মাঝে সামান্য ভূলবুঝাবুঝির কারনে সৃষ্ট ঘটনায় সামান্য উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে তাৎক্ষনিকভাবে পুলিশ ও সেনা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে টিয়ারশেল, রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। শহরের পরিস্থিতি বর্তমানে অনেকটাই শান্তিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারে রাঙামাটি শহরে সেনাবাহিনী-পুলিশ ও বিজিবি নামানো হয়েছে জানিয়ে পুলিশ সুপার রাঙামাটিবাসীকে কোনো প্রকার গুজবে কান না দিয়ে শান্তি ও সোহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে এবং সার্বিক পরিস্তিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকে সহযোগিতা করার আহবান জানিয়েছেন।

এদিকে কোনো প্রকার উষ্কানী ছাড়াই ব্যবসায়িদের উপর হামলা চালিয়ে তাদের দোকানপাট পুড়ে দিয়ে লুটপাট করার প্রতিবাদে করনীয় নির্ধারনে শহরের কলেজ গেইট এলাকায় জুরুরি মিটিংয়ের ডাক দিয়েছে কলেজ গেইট এলাকার ব্যবসায়ি সমিতি।

অপরদিকে শনিবারের ঘটনা পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে করনীয় নির্ধারনে বিশেষ আইন শৃঙ্খলা মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রাঙামাটির জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার। বেলা বারো টায় জেলা প্রশাসক সম্মেলন কক্ষে এই মিটিং অনুষ্ঠিত হবে বলে জেলা প্রশাসক অফিস সূত্রে জানাগেছে।