সরকারের অগনতান্ত্রিক নির্যাতনের কারণে সফল হতে পারছে না বিএনপি'

সরকারের অগনতান্ত্রিক নির্যাতনের কারণে বিএনপি রাজনীতির মাঠে সফল হতে পারছে না বলে মনে করেন বিএনপির স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু। তিনি বলেন, ‘বেগম জিয়া যেদিন তার পাশে থাকা মীর জাফরদের চিনতে পারবেন সেদিন বিএনপি সফল হবে। এই নেতাদের কারণেই বিএনপির আজ এই পরিস্থিতি।’ সাবেক এই উপমন্ত্রী বলেন, ‘তৃণমূলে বিএনপির নেতা-কর্মীরা অনেক শক্তিশালী। কিন্তু মীর জাফরদের কারণে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা মূল্যায়ন পায় না। সাংগঠনিকভাবে বিএনপি যদি চায় তাহলে আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব থাকবে না।’ সম্প্রতি তিনি একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাবিবুল্লাহ ফাহাদ ও কিরন সেখ

 
বর্তমান সরকার এক বছর পার করল। এই সময়টাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
একটা অবৈধ ও অগণতান্ত্রিক সরকারের কোনো কাজের বৈধতা থাকতে পারে না। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবেও এই সরকারের কোনো কাজের গ্রহণযোগ্যতা নেই। আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে। আমাদের রক্ত, ত্যাগ, তিতিক্ষা ও সংগ্রামের মাধ্যমে ১৯৯০ সালে যে স্বৈরশাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে দেশে গণতান্ত্রিক ধারা ফিরেছিল, আশা করেছিলাম এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। কিন্তু এখন দেশ চলছে অগণতান্ত্রিক সরকারের শাসনে।
 
এই সরকারকে কেন অগণতান্ত্রিক বলছেন?
কারণ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের নামে প্রহসনের মাধ্যমে অবৈধভাবে এক বছর ক্ষমতা ধরে রেখেছে।  
সংবিধান রক্ষার জন্য তো ওই নির্বাচনের বিকল্প ছিল না...
আমরাও ভেবেছিলাম হয়ত সংবিধান রক্ষার জন্য নির্বাচন করছে। বিএনপি ভেবেছিল ৫ জানুয়ারির পর আওয়ামী লীগ সব দলের অংশগ্রহণে আরও একটি নির্বাচন দেবে। কিন্তু তারা তা করেনি।
 
বিএনপিও তো একতরফা নির্বাচন করেছিল?
হ্যাঁ, বিএনপি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তা করেছিল। কিন্তু ওই নির্বাচনের পর আমরা কথা রেখেছি। সংসদে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাসের পর ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়িয়েছিল বিএনপি। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েছিল বলেই গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত ছিল।
 
রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের তো অনেক ঐতিহ্য রয়েছে। এই দলটিকে অবৈধ বলা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত?
আওয়ামী লীগের মতো ঐতিহ্যবাহী একটি দল স্বৈরাচারের মতো ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখবে, এটা জাতি এবং একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমার কাছে দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্য। বিয়ের আগে কোনো মেয়ে সন্তান জন্ম দিলে সেটা অবৈধ, আর বিয়ের পর সন্তান জন্ম দিলে সেটা হয় বৈধ। ঠিক তেমনি ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করাও অবৈধ।
 
বারবার বিএনপি আন্দোলনের ঘোষণা দিচ্ছে কিন্তু কোনো কর্মসূচি নেই, এর কারণ কী?
ঐতিহাসিক একটি ঘটনা উল্লেখ করা প্রয়োজন। নবাব সিরাজদ্দৌলা যখন পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন মীর মদন ও মহন লাল নবাবকে বলেছিলেন হুজুর আপনি মীর জাফরকে প্রধান সিপাহ সালার করবেন না। মীর জাফর ইংরেজদের সঙ্গে আঁতাত করেছে। তাকে প্রধান সিপাহ সালার করা হলে যুদ্ধে পরাজয় আমাদের অবধারিত। নবাব সেদিন মীর মদন ও মহন লালের কথা শুনেননি। সেদিন যদি নবাব মীর মদন ও মহন লালের কথা শুনতেন তাহলে সিরাজদ্দৌলাকে পলাশীর প্রান্তরে এভাবে বিপর্যয় ও পরাজয় বরণ করতে হতো না। ঠিক তেমনি বিএনপিতে কিছু মীর জাফর আছে, যারা বারবার বেগম জিয়ার সঙ্গে বেঈমানি করেছে। এখনও করছে। যেদিন বেগম জিয়ার ডানে ও বাঁয়ে কোনো মীর জাফর থাকবে না, সেদিন বিএনপি সফল হবে।
 
বিএনপি নেত্রী কি এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না?
আমরা অপেক্ষায় আছি বেগম জিয়া কবে উপলব্ধি করবেন কারা মীর জাফর, কারা মীর মদন ও মহন লাল। যেদিন তিনি মীর জাফরদের চিনতে পারবেন সেদিন আমাদের বিজয় অর্জন হবে।
 
তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে আন্দোলনের জন্য কতটুকু প্রস্তুত?
তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা অনেক শক্তিশালী। কিন্তু এই মীর জাফরদের কারণে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা মূল্যায়ন পায় না। সাংগঠনিকভাবে বিএনপি যদি চায় তাহলে আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব থাকবে না।
 
ঢাকায় বিএনপির কর্মসূচিতে নেতা-কর্মীদের খুব একটা মাঠে দেখা যায় না, কেন?
রাজনীতির কেন্দ্র হচ্ছে ঢাকা। ঢাকা যারা নিয়ন্ত্রণ করবে সারা দেশ তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এবার ঢাকা মহানগর বিএনপির দায়িত্বে যারা রয়েছেন তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং সেই  লক্ষ্যকে সামনে রেখে কাজও হচ্ছে। এবার ঢাকায় চূড়ান্ত আন্দোলন হবে।
 
হরতাল-অবরোধের বিকল্প কোনো কর্মসূচির চিন্তা কি বিএনপির আছে?
সরকার মানববন্ধন, মিছিল, মিটিং, সমাবেশ কিছুই করতে দিচ্ছে না। তাহলে বিএনপি কী করবে? যারা বলে হরতাল ক্ষতিকর ও বিরক্তিকর কর্মসূচি, তাদের কাছে আমি প্রশ্ন করতে চাই, তাহলে আপনারাই বলুন কী কর্মসূচি দিলে সরকার বাধা দেবে না, গুলি করবে না? সরকারের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে কীভাবে?
 
অতীতে কখনও কোনো ছাত্র সংগঠনের জন্য বড় রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি হয়নি এমন নজির কি আছে?
নজির আছে কি নেই এটা মুখ্য নয়। পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ছাত্রলীগ, যুবলীগ সব একাকার হয়ে গেছে। এরশাদ স্বৈরাচার ছিলেন কিন্তু তিনিও তো নির্বিচারে গুলি করেননি। আর এখন তো রাস্তায় দাঁড়ানো যায় না, পাখির মতো গুলি করে মানুষ মারছে। সবার তো জীবনের মায়া আছে।
 
গুলির ভয়ে বিএনপি কোনো কর্মসূচি দিতে পারছে না?
সরকারকে শুধু একবার গুলি বন্ধ করতে বলুন, এরপর যদি সরকার টিকে থাকতে পারে তাহলে আমি রাজনীতি ছেড়ে দেব। তারা শুধু গুলি ও জুজুর ভয় দেখায়। তবে জনগণের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। তারা এখন আর মৃত্যুকে ভয় করবে না। সরকারের সময় শেষ হয়ে এসেছে। খুব তাড়াতাড়ি সেটা আপনারা দেখতে পাবেন।
 
এ রকম কোনো সম্ভাবনা কি আছে?
১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান ক্ষমতা নেওয়ার পর ১৯৬৮ সালে দশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান করেছিল। জাঁকালো অনুষ্ঠান হয়েছিল সেটি। কিন্তু এরপর ১৯৬৯ সালে গণআন্দোলনের মুখে পড়তে হয় আইয়ুব খানকে এবং ’৭০ সালের নির্বাচনে তাদের ভয়াডুবি হয়। একাত্তরে দেশ স্বাধীন হয়। তাই আওয়ামী লীগ এখন যা করছে তারা নিজেরাও ভাবতে পারছে না তাদের কী হবে।
 
বিএনপি কি চাইলে সেদিন গাজীপুরে সমাবেশ করতে পারত না?
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, ২৭ ডিসেম্বর সমাবেশ করতে দেওয়া হয়নি তাতে কি হয়েছে, অবশ্যই বিএনপির উচিত ছিল ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে সমাবেশ করা।
 
সেটা কীভাবে?
বেগম জিয়ার উচিত ছিল গাজীপুরের উদ্দেশে রওনা হওয়া এবং যেখানেই বাধা দেওয়া হবে সেখানেই বসে পড়া। হোক না সেখানে পাঁচশ লোক। সারা পৃথিবীর মানুষ দেখত বেগম জিয়াকে সমাবেশ করতে দেওয়া হলো না। মূলত বিএনপির মীর জাফরাই বেগম খালেদা জিয়াকে সমাবেশে যেতে বাধা দিয়েছেন।
 
সরকার বিএনপিকে সমাবেশের অনুমতি দিচ্ছে না কেন?
সাম্প্রতিক সময়ে নাটোর, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, জামালপুরসহ বিভিন্ন জেলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিটি সমাবেশে ব্যাপক লোকসমাগম হয়েছে। নাটোরে সমাবেশ শেষে মানুষের প্রতিক্রিয়া ছিল তারা জন্মের পর এত বড় সমাবেশ দেখেনি। এটাই সরকারের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা ঈর্ষান্বিত হয়ে বিএনপিকে সমাবেশ করতে দিচ্ছে না।
 
সরকার তো বলছে সহিংসতার আশঙ্কায় সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না?
বিএনপির সমাবেশ হচ্ছে শান্তিপূর্ণ এবং সমাবেশে কোনো নিরাপত্তার অভাব দেখা দেয়নি। এমনকি কোনো উসকানিমূলক বক্তব্যও দেওয়া হয় না। তাহলে সহিংসতা এলো কোথা থেকে?
 
আন্দোলন করে কি সরকার পতন করা সম্ভব?
আমরা তো বলেনি জোর করে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেব। বিএনপি চায় নির্বাচন হোক, একই সঙ্গে ’৯০-এ যে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা ও গণআন্দোলন শুরু হয়েছে সেটাও রক্ষা করতে চায়। কিন্তু আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।
 
পুলিশি রাষ্ট্র বলছেন কেন?
পুলিশ মানুষ খুন করছে কিন্তু তার কোনো জবাবদিহিতা নেই। কারণ পুলিশ মনে করে, এই সরকার অবৈধ। আর সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে পুলিশ। পুলিশ যদি অন্যায় কাজ করে তাতে সরকারের কিছু বলার নেই। তারা ক্ষমতায় টিকে আছে প্রশাসনের ওপর ভর করে।
 
আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে কিন্তু প্রস্তুতি কতটুকু আছে?
অবশ্যই আন্দোলনের প্রস্তুতি আছে। প্রস্তুতির কথা শুনলে আগাম দমনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পুলিশ-র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়ে দমনের ষড়যন্ত্র করা হয়। এ বিষয়ে আগে না বলাই ভালো।
 
রাজনীতি করতে এসে জেল-মামলার ভয়ে পিছিয়ে যাওয়াকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
রাজনীতিতে জেল-জুলুম থাকবে। এ বিষয় মাথায় নিয়েই রাজনীতিতে এসেছি। কিন্তু বিনা কারণে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর জেলে আটকে রাখা হবে এটাতো হতে পারে না। আমি সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলব, সত্য কথা বলব এই কারণে আমাকে জেলে আটক করা হবে, এটাতো গণতন্ত্র নয়। গত ছয় বছরে আমাকে চার বছর জেলে থাকতে হয়েছে।
 
বিএনপির আন্দোলনে সরকার পদত্যাগে বাধ্য হলে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে যে সরকার দেশে ক্ষমতায় থাকবে তার রূপরেখা কি হতে পারে?
অবশ্যই নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার হতে হবে। যেহেতু বর্তমান সংবিধানে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নেই, তাই সংসদে তত্ত্বাবধায়ক বিল পাস করে সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে।
 
বিএনপি সরকারকে বৈধতা দেয়নি, তাহলে এই সরকার সংসদে তত্ত্বাবধায়ক বিল পাস করলে সেটা কি বৈধ হবে?
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপিকে কি আওয়ামী লীগ বৈধতা দিয়েছিল? দেয়নি। কিন্তু সে সময় তারা নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার মেনেছিল, বলেছিল সংবিধান রক্ষার জন্য তারা নির্বাচনে যাবে। ফলে বর্তমান সরকার সংসদে তত্ত্বাবধায়ক বিল পাস করলে বিএনপি সেটা বিবেচনা করবে।
 
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে বিএনপি ভালো ফল করত, আপনি কী মনে করেন?  
এটা অনেকেই বলে। কিন্তু উপজেলা নির্বাচনে গিয়ে সরকারের আসল রূপ দেখা গেছে। প্রথম ও দ্বিতীয় দফা উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছিল। সরকার তা দেখে পরের প্রতিটি ধাপে ভোট ছিনতাই করেছে। জোর করে জয় পেয়েছে। জাতীয় নির্বাচনেও তারা একই কাজ করত।
 
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে বক্তব্য দিয়েছেন তা তো ইতিহাসের বিকৃতি। তিনি এটা করছেন কেন?
স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে রাজাকার, পাকিস্তানের চর ও আইএসআইর এজেন্ট বলা হয়। তার ছেলে কি বাবা সম্পর্কে এসব কটূক্তি শুনতে পারেন? তারেক রহমান তো শেখ মুজিবুর রহমানের কবর জিয়ারত করেছেন। তখন তো তিনি বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কিছু বলেননি। যখন দেখেছেন তার বাবাকে নিয়ে কুৎসা রটানো হচ্ছে তখন তিনি মুখ খুলেছেন। বাবাকে কেউ গালি দিলে সন্তান তো চুপ থাকতে পারে না। জিয়াউর রহমানকে নিয়ে আওয়ামী লীগের কটূক্তি বন্ধ হলে বিএনপিও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কিছু বলবে না।